Home / অন্যান্য / বসন্ত দিনে ভালোবাসা সম্পর্কের বন্ধন মজবুত করুন!

বসন্ত দিনে ভালোবাসা সম্পর্কের বন্ধন মজবুত করুন!

ভালো থাকতে ও রাখতে যত্ন নিতে হয় ভালোবাসার। সম্পর্কের বন্ধন মজবুত করার বিশেষ এই সময়কে কেতাবি ভাষায় বলা হচ্ছে কোয়ালিটি টাইম। ব্যস্ত সময় থেকে কোয়ালিটি টাইম আলাদা করা জরুরি।

ভালোবাসার প্রতিটি দিন কিভাবে কাটে—এ নিয়ে আড্ডা হচ্ছিল তপু-সঞ্চিতা দম্পতির সঙ্গে। দেবাশিস শ্যাম তপু কাজ করছেন দ্য সিটি ব্যাংক লিমিটেডে সিনিয়র ম্যানেজার হিসেবে। আর সঞ্চিতা বিশ্বাস পেশায় চিকিৎসক, একটি বেসরকারি মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালে কর্মরত। প্রথমে তপু আলাপ শুরু করলেন, ‘আমরা দুজন দুই রকমের পেশায়, একজন ব্যাংকার, আরেকজন ডাক্তার। সপ্তাহজুড়েই ব্যস্ততা। ছুটির দিন একসঙ্গে মেলে না প্রায়ই। তাই কাজের মধ্যেই একটু অবসর বের করে ফেলি নিজেদের জন্য। সংসারের হালচাল, অফিসের সমস্যাগুলো ছাপিয়ে নিজেদের দূরত্ব কমাতে অফিস শেষে কখনো কফি শপে গিয়ে কফিতে হালকা চুমুক দিতে দিতে গল্প করি। দুই দিন একসঙ্গে ছুটি মেলাতে পারলে শহর ছেড়ে দূরে কোথাও চলে যাই। মাঝরাতে গাড়ি নিয়ে নিশুতি শহরে ঘুরে বেড়ানো আমাদের দুজনেরই খুব পছন্দ। আমার কাছে প্রতিদিনই ভালোবাসার দিন। সঙ্গীর সঙ্গে এবার সুর মেলালেন সঞ্চিতা। বললেন, ‘আমি মনে করি, পরিবর্তনশীল সব কিছুর সঙ্গে মানুষের মনও বদলে যায়। দিন-রাতের পালা বদলে পাশের মানুষটিরও একটু করে বদল হচ্ছে, খানিকটা বদলে যাচ্ছি আমিও। এই বদলে যাওয়া আমি আর তুমির সঙ্গে রোজ একবার পরিচিত হতে না পারলে চেনা মানুষ অচেনা হতে কতক্ষণ! তাই যত ব্যস্ততাই থাকুক, নিজেদের মনের দূরত্ব বাড়তে দিই না আমরা। সুন্দর একটি সম্পর্কের জন্য দুজনেরই সমানভাবে এগিয়ে আসতে হবে। পারস্পরিক চাওয়া-পাওয়াকে শ্রদ্ধা করে একটু সময় একসঙ্গে থাকা, কাছাকাছি আসার জন্য মুহূর্তগুলো নিজেদের মতো করে বের করে নিই।’

ছবি তোলার ফাঁকে ফাঁকে গল্প হচ্ছিল অভিনেত্রী শবনম ফারিয়ার সঙ্গে। মেকআপ ঠিকঠাক করতে করতে স্বপ্নিল চোখে জানালেন নিজের ভালোবাসার আকাঙ্ক্ষার গল্প, ‘যেকোনো সম্পর্ক যাচাইয়ের ক্ষেত্রে বিশ্বাস, যোগাযোগ ও সম্মান—এ তিনটি বিষয়কে প্রাধান্য দিই। ভালোবাসার বিষয়টিও এর ব্যতিক্রম না। দুজন দুজনের মানসিকতা, চিন্তাধারা, দোষ-গুণ, পছন্দ-অপছন্দ জানা এবং সম্মান করার মধ্য দিয়ে ভালোবাসার সার্থক রূপ দেওয়া সম্ভব। যোগাযোগ বিষয়টি এমন নয় যে প্রতিমুহূর্তের খোঁজ একে অন্যকে জানাতে হবে। যোগাযোগ আসলে মনের। পারস্পরিক বোঝাপড়া সহমর্মিতার চর্চা ভালোবাসাকে দীর্ঘজীবী করে।’

ভালোবাসা ও তার চর্চা সম্পর্কে জানতে চেয়েছিলাম লেখক রাসেল রায়হানের কাছে। বললেন, ‘শহুরে জীবনে ভালোবাসা প্রকাশের নানা উপলক্ষ, মাধ্যম এখন আমরা গ্রহণ করছি। ভ্যালেন্টাইনস ডে, পহেলা ফাল্গুন, বৈশাখ, রোজ ডে, ম্যারেজ ডে, নিউ ইয়ার ইত্যাদি দিবসে নিজেদের প্রেমকে বিভিন্নভাবে প্রকাশ করছি আমরা। অথচ সুদূর গ্রামের যুগল, যারা এসব দিবসের সব কটির নামও হয়তো জানে না, শহরের অনেক যুগলের তুলনায় তারা সুখী।’ এখানে গুরুত্বপূর্ণ বিষয়টি হচ্ছে, এত সব দিবসও কৃত্রিম লাগে, যখন হৃদয়বৃত্তিক কার্যকলাপকে ছাপিয়ে প্রেম হয়ে ওঠে প্রদর্শনের বিষয়। দাম্পত্য কিংবা প্রেমে সুখী হওয়ার জন্য বিভিন্ন উপলক্ষের সামান্য ভূমিকা থাকতে পারে, বললেন রাসেল। তবে সম্পর্কে গুরুত্বপূর্ণ হলো একে অপরকে সময় দেওয়া। অনুভব করা। সম্পর্কের সূক্ষ্ম যে বিষয়টি উপেক্ষা করার কোনো সুযোগ নেই, সেটি হলো, কোয়ালিটি টাইম। সারা দিন কাজ শেষে ফিরে শুধু সংসার বা পরিবারে সময় দিলে চলবে না, অল্প হলেও আলাদা সময় দিতে হবে সঙ্গীকে। বিষয়টি দুজনের জন্যই জরুরি। একে অপরের জন্য আলাদা করে রাখা এই সময়টুকুই ভালোবাসাকে করে রাখবে স্বর্গীয় ও চিরনতুন। ভালোবাসা অনুভবের প্রথম দিনটির মতো প্রতিদিন একবার হলেও ভাবুন, সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ মানুষটিকেই আমি জীবনসঙ্গী হিসেবে পেয়েছি। সার্বক্ষণিক এই অনুভূতি থাকলে ভালোবাসা প্রকাশে কোনো কৃত্রিমতা থাকবে না, থাকবে না অপূর্ণতা। সুখকে তখন আলাদা করে খুঁজতে হবে না, নিজ উদ্যোগে সুখই আমাদের খুঁজে নেবে।

রাজশাহী ক্যান্টনমেন্ট পাবলিক স্কুল ও কলেজে শিক্ষকতা করছেন বিজয় লক্ষ্মী চৌধুরী। ঢাকা বইমেলা প্রাঙ্গণে দেখা হলো তাঁর সঙ্গে। জানালেন, ‘সঙ্গী গৌতম রায় শিক্ষক ও গবেষক হিসেবে কাজ করছেন রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ে। দুজনেই কর্মজীবী হওয়ায় একসঙ্গে কোয়ালিটি টাইম কাটানোর সুযোগ কমই পাই আমরা। তবু প্রতিদিন অন্তত এক বেলা একসঙ্গে খেতে খেতে গল্প করি, কিংবা বলতে পারেন এলেবেলে গল্প করতে করতে খাই। কখনো একটু সময় হলে মুভি দেখতে বেরিয়ে পড়ি, কিংবা পছন্দের রেস্তোরাঁর প্রিয় টেবিলটাতে গিয়ে বসি। কোয়ালিটি টাইম বলতে এই, এতেই আমাদের ভালোবাসা রিচার্জ হয়ে যায় বলতে পারেন। মাঝেমধ্যে কর্মস্থলে ফিরে দেখি, সে রান্না করে কাজ এগিয়ে রেখেছে। এটুকু বোঝাপড়া আর সহযোগিতাও আমার কাছে ভালোবাসারই প্রকাশ মনে হয়।’ মান-অভিমানের ভালোবাসা প্রসঙ্গে বললেন, ‘গৌতম অস্বাভাবিক রকম চা-প্রেমী। তার প্রতি আমার ভালোবাসা প্রকাশের মাধ্যমের একটা বড় অংশ জুড়ে আছে চা। ছোট ছোট মান-অভিমান কড়া লিকারের এক কাপ চায়েই গলে জল হয়ে যায়। এদিকে আমি আবার শাড়িপ্রেমী। শাড়ি পরে ছবি তুলে স্মৃতি ধরে রাখতে খুব ভালোবাসি। গত বছর বিয়েবার্ষিকীতে অনেক দিনের পছন্দ করা একটি শাড়ি উপহার দিয়ে চমকে দিয়েছিল। সঙ্গে ছিল একটি অ্যালবামজুড়ে আমাদের ছবি। আনন্দে চোখে পানি এসে গিয়েছিল। প্রতিবছর দুজনে একসঙ্গে বইমেলায় আসতাম। এবার তাঁর বই বের হয়েছে, অথচ সে দেশে নেই। তাই একাই এসেছি। তাঁর লেখা বইটা হাতে নিয়ে আমাদের প্রিয় জায়গাটায় বসে ছবি তুলে ওকে পাঠাব। কাছে থাকুক বা বহু দূরে, একে অপরকে অনুভব করার নামই তো ভালোবাসা।’

বেসরকারি টিভি চ্যানেলে অ্যাসিস্ট্যান্ট জয়েন্ট নিউজ এডিটর হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন সাবিহা সুলতানা। ভালোবাসার সংসার কেমন—প্রশ্নের উত্তরে জানালেন, ‘সুখী সম্পর্কের জন্য ভালো লাগা, মন্দ লাগা থেকে শুরু করে দুজনের চিন্তা, দর্শন কিংবা প্রতিদিনের অনুভূতি যতটা সম্ভব একে অপরকে জানানো প্রয়োজন। শুধু ভালোবাসা না, অভিযোগ বা রাগও আমি অকপটে প্রকাশ করি। এদিকে সঙ্গী মাহবুব রহমান খুব চাপা প্রকৃতির মানুষ। ভালোবাসা বা রাগ কোনোটাই সহজে প্রকাশ করে না সে। তার অভিমানের কারণ বা ভালোবাসা দুই-ই আমাকেই খুঁজে নিতে হয়। সে মুখে না বললেও নিয়ম করে নিজের ভালো লাগা, ভালোবাসার কথা আমি নিজেই বলি। আমাদের কাজে আর প্রতিদিনের রুটিনও একেবারেই আলাদা। তার ৯-৫টা অফিস। আমার কখনো ভোরে, কখনো দিনে, আবার কোনো দিন রাতেও অফিস করতে হয়। আমার কাজের সময়ের প্রভাব স্বাভাবিকভাবেই তাকেও প্রভাবিত করে। বিয়ের প্রথম দিকে মানিয়ে নিতে দুজনেরই যথেষ্ট বেগ পেতে হয়েছে। ছাড় দিতে হয়েছে দুজনকেই। কিন্তু একটা সময় আমরা দুজনেই সুবিধাজনক রুটিনে আসতে পেরেছি। সম্পর্কের সব বিষয়কে নিয়মে বাঁধা যায় না। এই সময়টাতে অন্য সবার চেয়ে আলাদা হয়ে পাশের মানুষটিকে তার মতো বুঝতে পারাই হলো সম্পর্কের সার্থকতা, ভালোবাসার পূর্ণতা। অগোছালো ঘরের মতো সম্পর্কও এলোমেলো হয়, আর ব্যক্তিগত যত্নের মতোই সম্পর্কের ক্ষেত্রেও যত্ন নেওয়া জরুরি।’

সম্পর্কে কোয়ালিটি টাইমের গুরুত্ব নিয়ে প্রত্যয় মেডিক্যাল কলেজের মনোবিজ্ঞান বিভাগের অধ্যাপক তামিমা তানজিন বললেন, ‘প্রেম ও ভালোবাসার মতো আবেগীয় বিষয়গুলো ধ্রুব হয় না। সম্পর্ক প্রতিদিনই নতুন করে চর্চা করতে হয়। আমাদের সংস্কৃতি ও জীবনযাপনে ভালোবাসার চর্চার প্রচলন তেমন নেই। দাম্পত্য জীবনের কয়েক বছর পার হলেই সব রোমান্টিকতা উধাও হওয়ার এটা বিশেষ কারণ। ভালোবাসা ধারণ করার পাশাপাশি সেটা প্রকাশ করাও গুরুত্বপূর্ণ। দুজনকেই খেয়াল রাখতে হবে সংসারজীবন যেন একঘেয়ে অভ্যাস হয়ে না দাঁড়ায়। অনেকবার বলা কথাগুলোই এদিন আবার বলুন প্রিয় মানুষকে। দূর হবে সম্পর্কের অনেক জটিলতা। সারা দিনে একবার হলেও দুজন মিলে কিছুক্ষণের জন্য একা হয়ে যান। দুজনের সুবিধামতো সময়ে অন্তত আধঘণ্টার জন্য হলেও একে অপরকে সময় দিন। নিজেদের কথা বলুন। স্বপ্ন দেখুন, হাসুন, প্রাণ খুলে কথা বলুন। যেকোনো এক বেলা পরিবারের সবাই একসঙ্গে বসে খাবার খান। বিশেষ বিশেষ দিন নয়, জীবনের প্রতিটি দিন হোক ভালোবাসার দিন।’

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *